কবিরাজ থেকে ডাক্তার গোঁড়ামি ভেঙে গড়লেন ইতিহাস

সৌভিক রায় :
(প্ৰথম পর্ব)
মধুসূদন গুপ্ত চিকিৎসা বিজ্ঞানের ইতিহাসে একটি বিরলতম প্রতিভা এবং অদম্য সাহসের নাম। এমন একটি ঘটনা ঘটালেন যা বদলে দিলো উপমহাদেশের চিকিৎসা বিজ্ঞান চর্চা। কয়েক ধাপ এগিয়ে গেলো ভারতবর্ষ.. আসছি সে কথায় আগে মধুসূদন গুপ্তের একটু পরিচয় দিয়ে নি বরং!

মধুসূদন গুপ্তের জন্ম হুগলি জেলার বৈদ্যবাটিতে
১৮০৬ সালে মতান্তরে ১৮০০ সালে। তিনি ছিলেন বৈদ্য পরিবারের একজন সদস্য। তাঁর পরিবারের অনেকেই ছিলেন আয়ুর্বেদের চিকিৎসক। গুপ্ত পরিবার ছিলো তদানীন্তন বাংলার চিকিৎসা মানচিত্রের এক উজ্জ্বল পরিবার। তাঁর পিতামহ ছিলেন হুগলির নবাব পরিবারের গৃহ চিকিৎসক।
ছোটবেলা থেকে মধুসূদন ছিলেন দুরন্ত! পড়াশোনায় বিশেষ মনোযোগীও ছিলেন না। কৈশোর বয়সে তিনি বাড়ি থেকে পালিয়ে যান। এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে; অন্য একটি কিংবদন্তি অনুযায়ী পড়াশুনায় অমনোযোগী এবং অবাধ্য হওয়ায় তাঁর পিতা মধুসূদন গুপ্তকে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেন। পরবর্তীতে ১৮২৪ সালে তাঁর যখন খোঁজ পাওয়া যায় তখন তিনি সংস্কৃত কলেজের ছাত্র তখন।

বৌবাজার এলাকায় ইতিমধ্যেই একটি ভাড়াবাড়িতে কলিকাতা সংস্কৃত কলেজের পঠনপাঠন শুরু হয়ে গিয়েছিলো। ১৮২৬ সালে স্থায়ী ঠিকানা অর্জন করে সংস্কৃত কলেজ। ১৮২৭ সালে সংস্কৃত কলেজে বৈদ্যক অর্থাৎ আয়ুর্বেদ বিভাগ চালু হয়। সূচনালগ্নে সাত জন ছাত্র ছিলেন, যাঁদের মধ্যে মধুসূদন ছিলেন অন্যতম। তাঁদের শিক্ষক ছিলেন ক্ষুদিরাম বিশারদ।

আয়ুর্বেদ বিদ্যায় অসাধারণ কৃতিত্ব অর্জনের পাশাপাশি সংস্কৃত, ন্যায়শাস্ত্র, সাহিত্য, অলংকার ইত্যাদি বিষয়ও তিনি তাঁর মুন্সিয়ানার ছাপ রেখেছিলেন। ওই সময়টাতে মধুসূদন গুপ্ত কেবলরাম কবিরাজের কাছে আয়ুর্বেদ চর্চা করতেন। এরপর তিনি গ্রামে ঘুরে ঘুরে আয়ুর্বেদ চিকিৎসা করতেন। কেবলরাম কবিরাজ বৈদ্যর কাছে শেখা দেশজ পদ্ধতিতে রোগ নির্ণয় এবং তা ওষুধ প্রয়োগের মাধ্যমে নিরাময়ের জ্ঞান তাঁকে সমৃদ্ধ করেছিলো। গ্রামে গ্রামে রোগী দেখার ব্যাবহারিক অভিজ্ঞতা তাঁকে চিকিৎসা শাস্ত্রে বেশ কয়েকধাপ এগিয়ে দিয়েছিলো।

সংস্কৃত কলেজে আয়ুর্বেদশাস্ত্র অধ্যায়ণরত অবস্থাতেই শারীরতত্ত্ব সম্পর্কে তাঁর আগ্রহ সৃষ্টি হয়। কাঠ বা মোম দিয়ে তৈরি বিভিন্ন অস্থির নমুনা গুলি তিনি খুঁটিয়ে দেখতেন। বিভিন্ন জীবজন্তুর দেহ ব্যবচ্ছেদ করে তিনি শরীরতত্ত্বের চর্চা করতেন এবং এই বিভিন্ন প্রাণীর ব্যবচ্ছেদ করতে করতে তিনি এতে সিদ্ধহস্ত হয়ে উঠেন।

ঐ সময়ে চিকিৎসাশাস্ত্র সংক্রান্ত সব বইই ছিলো ইংরেজি ভাষায়। তিনি ইংরেজি ভাষা রপ্ত করে বিদেশী বইগুলি পড়তে শুরু করেছিলেন। সংস্কৃত কলেজে পড়াকালীন তিনি হুপারের লেখা “Anatomist’s Vade Mecum” বইটি সংস্কৃতে অনুবাদ করে, ১০০০ টাকা পুরস্কার লাভ করেছিলেন।

স্থানীয়দের, চিকিৎসা দানের জন্যে ১৮৩২ সালের জানুয়ারীতে সংস্কৃত কলেজের পাশেই একটি একতলা বাড়িতে হাসপাতাল স্থাপিত হয়েছিলো। সংস্কৃত কলেজের শিক্ষকেরা এসে এখানেও ক্লাস নিতেন এবং সেই সঙ্গেই চিকিৎসাবিজ্ঞান বিষয়ে বক্তৃতা দিতেন। এঁদের বক্তৃতাগুলো মনোযোগ সহকারে নিয়মিত শুনতেন মধুসূদন গুপ্ত। ফলে স্বভাবতই তাঁর সহপাঠিদের তুলনায় তাঁর জ্ঞানভান্ডার যথেষ্ট সমৃদ্ধ ছিল।

১৮৩৫ সালে কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ প্ৰতিষ্ঠা হওয়ার পর সংস্কৃত কলেজের আয়ুর্বেদ শাস্ত্রের বিভাগটি বন্ধ হয়ে যায়, বরং বলা ভালো বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিলো। কিন্তু থেকে গিয়েছিলেন মধুসূদন গুপ্ত; উনবিংশ শতকের তিনের দশক মে মাস! একে গরমের দুপুর আর সেই সঙ্গেই উত্তপ্ত হয়ে উঠলো মেডিক্যাল কলেজ, ছাত্রদের আন্দোলন। আন্দোলন শুরু করেছিলেন সংস্কৃত কলেজের আয়ুর্বেদ বিভাগের ছাত্ররা।

কিন্তু কিসের দাবীতে এই আন্দোলন?.. এক সহপাঠীকে শিক্ষক নিযুক্ত করার প্রতিবাদে আন্দোলন করেছিলেন ঐ ছাত্রের বন্ধুবান্ধবেরা।
তদানিন্তন পত্রিকা ‘সমাচার চন্দ্রিকা’তে এই আন্দোলনের খবর প্রকাশিত হয়েছিলো, ‘শ্রীযুক্ত ক্ষুদিরাম বিশারদ কর্ম্মে রহিদ হইলে তৎপদে তাঁহার এক ছাত্র শ্রীযুত মধুসূদন গুপ্ত নিযুক্ত হওয়াতে অন্য ছাত্রেরা সমাধ্যায়ির নিকট পাঠ স্বীকার না করাতে কালেজাধ্যক্ষ মহাশয়েরা তাঁহারদিগের প্রার্থনা পূর্ণ না করাতে সকলে কালেজ ত্যাগ করিয়াছেন…।’ এই মর্মে খবর প্রকাশিত হয়েছিলো।

আয়ুর্বেদ বিশারদ ক্ষুদিরামবাবু ওই বছর ৩০ এপ্রিল শিক্ষকতার পেশা থেকে অবসর গ্রহণ করেছিলেন এবং তাঁর মেধাবী ছাত্র মধুসূদন গুপ্তকে তাঁর নিজের পদে বহাল করার জন্যে উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে সুপারিশ করেছিলেন। কর্তৃপক্ষ তাঁকে গ্রহণ করেছিলো। কিন্তু একজন সহপাঠীকে শিক্ষক হিসেবে মেনে নিতে তাঁর শিক্ষার্থীরাই আপত্তি জানায়। অ্যানাটমিতে তাঁর অসীম মেধা প্রত্যক্ষ করে সাহেব চিকিৎসক ডা. ব্রামলি, ডা. গুডিভ প্রমুখেরা তাঁকে সহশিক্ষক হিসেবে গ্রহণ করলেন। কর্তৃপক্ষ তাঁদের সিদ্ধান্তে অনড় থাকায় ছাত্রদের আন্দোলন স্থিমিত হয়ে পড়ে। মধুসূদন গুপ্ত শিক্ষকতা শুরু করলেন, পরবর্তী বছর তিনেকের মধ্যেই অ্যানাটমির প্রখ্যাত শিক্ষক হয়ে উঠেছিলেন একদা কবিরাজ মধুসূদন গুপ্ত।

তদানীন্তন খাতায় কলমের হিসেবে জানাচ্ছে, ১৮৩৫ সালের ১৭ই মার্চ থেকে তিনি মেডিকেল কলেজের ডেমোনস্ট্রেটর পদে আসীন হন এবং সহকারী অধ্যাপকের কাজ করতে থাকেন। এই সময়ে তাঁর বেতন ছিলো মাসিক ৩০ টাকা। তাঁকে কিন্তু একজন পাশ করা ডাক্তারের সমতুল্য পরীক্ষাও দিতে হয়েছিলো এবং তিনি সসম্মানে উত্তীর্ণও হয়েছিলেন। অ্যালোপ্যাথির চিকিৎসক হিসেবে প্রথাগত ডিগ্রিও তাঁর ছিল না। শিক্ষকতা করার সময়েই ১৮৪০ সালে তিনি পরীক্ষা দিয়ে অ্যালোপ্যাথির ডিগ্রি লাভ করেছিলেন।

কিন্তু ১৮৩৬ সালের ১০ই জানুয়ারি তারিখটা কেন বিখ্যাত? কি ঘটেছিলো সে দিনে? ভারতীয় উপমহাদেশে আর মধুসূদন গুপ্তের জীবনে কি এমন হয়েছিলো সেই দিন? ঐ দিন সৃষ্টি হয়েছিলো ইতিহাস! শত শত বছরের অন্ধবিশ্বাস সংস্কার গোঁড়ামি খান খান হয়ে গিয়েছিলো ঐ দিন! ভারতে প্রথম শব ব্যবচ্ছেদ করেছিলেন মধুসূদন গুপ্ত। যার মাধ্যমে এক নতুন যুগ শুরু হয়েছিলো ভারতীয় উপমহাদেশের চিকিৎসাশাস্ত্রে। আধুনিক ভারতের প্রথম বিজ্ঞানসম্মত শব ব্যবচ্ছেদ বলাই ভালো ! এবং সেই সঙ্গেই এটিই ছিল কলকাতা তথা বাংলারও প্রথম শব ব্যবচ্ছেদ। ধর্মীয় অন্ধবিশ্বাস প্রাচীনপন্থা সব.. সব পরাজিত হয়ে গিয়েছিলো নিমেষে। বিজ্ঞানের আলোতে কেটে গিয়েছিলো শত শত বছরের আঁধার।

close