পোস্ট এডিটরিয়াল : বাস্তবে নয়, মিডিয়ায় দ্বিতীয় হয়েছে তৃণমূল।

ত্রিপুরার ফলাফল নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণে বিশিষ্ঠ সাংবাদিক দেবাঞ্জন কর।

সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে ত্রিপুরা পুর নির্বাচনের ফলাফল। বিজেপি বিপুল ভাবে ত্রিপুরায় ক্ষমতা দখল করতে সক্ষম হলেও পরাজিত হয়েও এই ফল ব্যাপক অক্সিজেন যোগাচ্ছে এ রাজ্যের শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেস কে। বাংলার মিডিয়া তথা তৃণমূলের স্যোশাল মিডিয়া সেল ব্যাপক ভাবে প্রচার করে চলেছে প্রথমবার ত্রিপুরায় পা রেখেই, তিন মাস প্রচারে দ্বিতীয় স্থান পেয়ে প্রধান বিরোধী দল হয়েছে। এমন কি কোথাও কোথাও তৃণমূলের ভোট শতাংশ ২৮-৩০% ও দেখানো হয়েছে। এই দুটো তথ্য ই বিকৃত সত্য।

পরিসংখ্যান নিয়ে অবশ্যই আলোচনা করবো, কিন্তু তার আগে এই নির্বাচনের পূর্ববর্তী চেহারা টা একবার দেখে নেওয়া যাক। আমরা নিশ্চয় ২০১৮ এ রাজ্যের পঞ্চায়ত নির্বাচন ভুলে যাইনি। কথায় বলে “তুমি অন্য কে যে পথ দেখাবে, তোমায় ও সেই পথ ই কেউ না কেউ দেখিয়ে যাবে।” বামেরা যে অভিযোগ করেছে বাংলার মডেলে ভোট করিয়েছে বিপ্লব দেবের প্রশাসন সে অভিযোগ একেবারেই মিথ্যে নয়। ত্রিপুরায় মোট ২০টি পুরসভার ৩৩৪টি আসনের মধ্যে ১১২টি আসন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়ী হয় শাসকদল বিজেপি।যার মধ্যে আরো উল্লেখযোগ্য পাঁচটি পুরসভায়, যথা বিশালগড়, উদয়পুর, মোহনপুর, রানিরবাজার, সান্তিরবাজার, এবং কমলপুরে ভোট গ্রহনের আগেই বোর্ড গঠন করার পর্যায়ে পৌঁছে যায় গেরুয়া শিবির। বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়লাভ করে কমলপুর ও জিরানিয়া নগর পঞ্চায়েতেও। ত্রিপুরার মোট ৩৩৪ টি আসনের মধ্যে ভোট হয়েছে মাত্র ২২২ টি তে, মানে প্রায় ৩০% আসনে প্রার্থী ই দিতে দেওয়া হয়নি বিরোধীদের। গণতন্ত্রের জন্য এটা ভয়ঙ্কর একটি সংকেট। বিজেপি সব কটিতে মনোনয়ন জমা দিলেও বামেরা জমা দিতে সক্ষম হয় ২২২ টি আসনে। অন্যদিকে তৃণমূল মনোনয়ন জমা দেয় ১২৫ টি আসনে। আর কংগ্রেস জমা দেয় ১০১ টি আসনে। তৃণমূল প্রথম বার সে রাজ্যে সক্রিয় অংশগ্রহণ করে সব আসনে প্রার্থী পাবে না সে কথা ঠিক, তবে ৩০ বছর ক্ষমতায় থাকা বামেরা প্রার্থী দিতে না পারা আদপে সেখানে শাসকের সন্ত্রাস কেই মান্যতা দেয়। নির্বাচন কমিশনের পরিসংখ্যান বলছে, যে ২২২ টি আসনে নির্বাচন হয়েছে তাঁর মধ্যে বিজেপি জয় পেয়েছে ২১৭ টি আসনে। বাকি ৫টি আসনের মধ্যে বামফ্রন্ট ৩ টি এবং তৃণমূল ও তিপ্রা মথা ১ টি করে আসন জিতেছে। বাংলার মিডিয়া প্রতিদিন তৃণমূলের উপর হামলার যে ছবি দেখিয়েছে, সেখানে ব্রাত্য ছিলো বামেরা। বামেদের উপর আক্রমণের মাত্রা টা অনেকাংশেই বেশী ছিলো। বিজেপি ও জানতো সুকৌশলে তৃণমূলে কে মিডিয়ার সামনে এনে দিলে, সিমপ্যাথি ভোটে বিরোধী ভোটে ভাগ বসিয়ে আদপে সুবিধা করে দেবে বিজেপি কেই।

নির্বাচন কমিশনের তরফে বিস্তারিত পরিসংখ্যান প্রকাশে ক্ষানিক বিলম্ব কে হাতিয়ার করেই তৃণমূল কে দুই নম্বরে তুলে আনে বাংলার একাধিক নামজাদা ও প্রথম শ্রেনীর মিডিয়া। অর্ধ সত্য প্রকাশিত করা হয়েছে সব ক্ষেত্রেই। তৃণমূল বেশ কিছু আসনে ভালো ফল করলেও সামগ্রিক ভাবে ২৮% ভোট তারা পায়নি। সামগ্রিক হিসাবে ২ নং এও নেই তৃণমূল। তারা যে কটি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলো সেই নিরিখে দুই তে থাকলেও নিয়ম অনুযায়ী প্রধান বিরোধী নির্নয় হয় যে কটি আসনে নির্বাচন হয়েছিলো তার সামগ্রিক ফলের উপর। সহজ একটা উদাহরণ দি। ধরুন ১০ টি আসনে নির্বাচন হয়েছে। এ জিতেছে ৬টি, বি ৩টি এবং সি ১ টি। ভোটের হিসাবে এ ৪৫% বি ৩৫% ও সি ২০%। আবার সি যে আসন টি জিতেছে সেখানে তারা পেয়েছে ৪৮% ভোট, তার মানে কি সর্বোচ্চ ভোট শতাংশ পেয়ে তারাই প্রধান। এখানেও ব্যাপার টা সেরকম ই। কমিশনের পরিসংখ্যান অনুযায়ী বিজেপি পেয়েছে ৬০% ভোট। বামফ্রন্ট পেয়েছে ১৯.৯৯ শতাংশ। তৃণমূল কংগ্রেস ১৬.৬৮% ভোট পেয়েছে। আর কংগ্রেস ২.০৭% ভোট পেয়েছে। তৃণমূলের এই ১৬ শতাংশ ভোট প্রাপ্তির সিংহ ভাগই রয়েছে আগরতলা পুরনিগমের ১৩ টি ওয়ার্ডে। যে ১৩ টি ওয়ার্ডে দ্বিতীয় স্থান দখল করেছে সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেস, তার মধ্যে ৫ টি যায়গায় বামফ্রন্টের কোন প্রার্থী ছিলনা। মানে ত্রিমুখী লড়াই করে দ্বিতী স্থান পেয়েছে তৃণমূল মাত্র ৮টি আসনে। বাকি ৩৮ টি ওয়ার্ডে দ্বিতীয় হয়েছে বামফ্রন্ট!

সাত সকাল থেকেই বাংলার মেইন স্ট্রিম মিডিয়ার হেডলাইন দেখে স্বাভাবিকভাবেই উচ্ছ্বসিত এরাজ্যের তৃণমূল সমর্থকরা। বাংলার সীমানা পেরিয়ে ভিনরাজ্যেও এবার ক্ষমতা দখলের পথে ‘প্রিয়’ দিদির দল। কিন্তু বাস্তব অন্য চিত্র বলছে। ত্রিপুরা নিয়ে স্বয়ং অভিষেক ব্যানার্জী কে মন্তব্য করেছেন তিনি নিজেও জানেন সেটা বিকৃত সত্য। কর্মীদের মনোবল চাঙ্গা করতেই এ হেন মন্তব্য করতে হয়। পরিশেষে ত্রিপুরায় যেভাবে নির্বাচন করিয়ে বিপুল ভাবে ক্ষমতা দখল করলো বিজেপি সেই পদ্ধতি তে কিন্তু ২০২৪ এর বৈতরণী পার হওয়া খুব একটা সহজ হবে না।

close